কিস্তোয়ার জরিপ কী? কিস্তোয়ারে কী কী কাজ হয়?
By admin / September 20, 2026
ভূমি জরিপের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ

কিস্তোয়ার জরিপ কী?

কিস্তোয়ার পর্যায়ে কী কাজ হয়, কীভাবে জমি পরিমাপ ও নকশায় অঙ্কন করা হয় এবং পরবর্তী খানাপুরী ও বুঝারত পর্যায়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা।

কিস্তোয়ার জরিপ কী?

কিস্তোয়ার হলো ভূমি জরিপের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাঠ পর্যায়ের ধাপ। এই পর্যায়ে আমিনগণ ট্রাভার্স পয়েন্টের সাহায্যে সরেজমিনে প্রতিটি ভূমিখণ্ডের পরিমাপ করেন এবং সেই পরিমাপ অনুযায়ী ভূমিখণ্ডের প্রতিচ্ছবি নকশা বা ম্যাপে অঙ্কন করেন।

অর্থাৎ, কিস্তোয়ারের মূল কাজ হলো মাঠে থাকা জমির প্রকৃত অবস্থান, আকার ও সীমানার ভিত্তিতে তার প্রতিচ্ছবি জরিপের নকশায় তুলে ধরা। সরকারি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের বর্ণনা অনুযায়ী, এই পর্যায়ে ট্রাভার্স পয়েন্টের সাহায্যে সরেজমিন মোতাবেক প্রতিটি ভূমিখণ্ড পরিমাপ করে P-70 সিটে তার প্রতিচ্ছবি অঙ্কন করা হয়।

সহজ ভাষায়: কিস্তোয়ার হলো মাঠে জমি মাপার এবং সেই মাপ অনুযায়ী জমির প্রতিচ্ছবি নকশায় অঙ্কন করার কাজ।

কিস্তোয়ার কি আলাদা কোনো জরিপের নাম?

কিস্তোয়ারকে CS, SA, RS বা BS-এর মতো আলাদা কোনো জরিপের ধরন হিসেবে বোঝা ঠিক নয়। এটি একটি ভূমি জরিপের কার্যধাপ।

একটি জরিপ কার্যক্রমে ট্রাভার্স সার্ভে, কিস্তোয়ার, খানাপুরী, বুঝারত, তসদিক, খসড়া প্রকাশনা, আপত্তি, আপিল এবং চূড়ান্ত প্রকাশনাসহ বিভিন্ন পর্যায় থাকে। কিস্তোয়ার সেই ধারাবাহিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাঠ পর্যায়।

মনে রাখুন: CS, SA, RS, BS ইত্যাদি হলো জরিপের ধরন বা পরিচিতি; আর কিস্তোয়ার হলো জরিপ পরিচালনার একটি নির্দিষ্ট ধাপ।

কিস্তোয়ারে কী কী কাজ হয়?

কিস্তোয়ার পর্যায়ে মূলত জমির পরিমাপ এবং সেই পরিমাপের ভিত্তিতে নকশা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়। এ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো হলো—

১ সরেজমিনে ভূমিখণ্ড পরিমাপ

আমিনগণ মাঠে গিয়ে প্রতিটি ভূমিখণ্ডের অবস্থান ও সীমানা সরেজমিনে যাচাই করে পরিমাপ করেন। জমির প্রকৃত অবস্থাকে নকশায় সঠিকভাবে উপস্থাপনের জন্য এই পরিমাপ করা হয়।

২ ট্রাভার্স পয়েন্ট ব্যবহার

কিস্তোয়ার পর্যায়ে পূর্বে স্থাপিত ট্রাভার্স পয়েন্টের সাহায্যে ভূমিখণ্ডের অবস্থান ও পরিমাপ নির্ধারণ করা হয়। ট্রাভার্স জরিপের মাধ্যমে স্থাপিত এই পয়েন্টগুলো পরবর্তী নকশা প্রণয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

৩ ভূমিখণ্ডের প্রতিচ্ছবি অঙ্কন

মাঠে পরিমাপ করা ভূমিখণ্ডের আকার ও অবস্থান অনুযায়ী তার প্রতিচ্ছবি জরিপের সিটে অঙ্কন করা হয়। সরকারি ভূমি জরিপের বর্ণনায় এই অঙ্কনের জন্য P-70 সিটের উল্লেখ রয়েছে।

৪ জমির সীমানা নকশায় উপস্থাপন

পরিমাপের মাধ্যমে নির্ধারিত ভূমিখণ্ডের সীমানা ও অবস্থান নকশায় উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে একটি মৌজার বিভিন্ন ভূমিখণ্ডকে পৃথকভাবে নকশায় চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।

P-70 সিট কী?

কিস্তোয়ার পর্যায়ে মাঠে পরিমাপ করা ভূমিখণ্ডের প্রতিচ্ছবি যে সিটে অঙ্কন করা হয়, সরকারি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সেটিকে P-70 সিট বলা হয়।

এই সিটে ভূমিখণ্ডের অবস্থান ও আকৃতি নকশার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তী জরিপ কার্যক্রমে এই নকশা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

গুরুত্বপূর্ণ: কিস্তোয়ার পর্যায়ের মূল লক্ষ্য হলো জমির মালিকের নাম খতিয়ানে লেখা নয়; বরং সরেজমিনে ভূমিখণ্ড পরিমাপ করে তার প্রতিচ্ছবি নকশায় অঙ্কন করা।

ট্রাভার্স জরিপ ও কিস্তোয়ারের সম্পর্ক

কিস্তোয়ার কাজ বোঝার জন্য ট্রাভার্স জরিপ সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। নতুন মৌজা নকশা তৈরির ক্ষেত্রে ট্রাভার্স জরিপের মাধ্যমে মৌজা সীমানা বরাবর বিভিন্ন ট্রাভার্স ও সাব-ট্রাভার্স পয়েন্ট স্থাপন করা হয়।

এরপর এসব ট্রাভার্স পয়েন্টকে ভিত্তি করে কিস্তোয়ার পর্যায়ে আমিনগণ সরেজমিনে প্রতিটি ভূমিখণ্ড পরিমাপ করেন এবং নকশায় তার প্রতিচ্ছবি অঙ্কন করেন।

ট্রাভার্স জরিপের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি ও ট্রাভার্স পয়েন্ট স্থাপন।
কিস্তোয়ার ট্রাভার্স পয়েন্টের সাহায্যে ভূমিখণ্ড পরিমাপ ও নকশায় অঙ্কন।

কিস্তোয়ারের পর কোন কাজ হয়?

কিস্তোয়ার পর্যায়ে ভূমিখণ্ডের প্রতিচ্ছবি নকশায় অঙ্কন করার পর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো খানাপুরী।

খানাপুরী পর্যায়ে কিস্তোয়ারকৃত প্রতিটি ভূমিখণ্ডের ওপর পৃথক দাগ নম্বর প্রদান করা হয়। এরপর মালিকের রেকর্ড, দলিলপত্র ও দখল যাচাই করে মালিকের নাম, ঠিকানা এবং অন্যান্য তথ্য খতিয়ানে লিপিবদ্ধ করা হয়।

ধাপ প্রধান কাজ ফলাফল
ট্রাভার্স জরিপের ভিত্তি হিসেবে ট্রাভার্স ও সাব-ট্রাভার্স পয়েন্ট স্থাপন। পরবর্তী ভূমি পরিমাপের জন্য ভিত্তি তৈরি।
কিস্তোয়ার সরেজমিনে প্রতিটি ভূমিখণ্ড পরিমাপ করে নকশায় প্রতিচ্ছবি অঙ্কন। ভূমিখণ্ডের আকৃতি ও অবস্থান নকশায় উপস্থাপন।
খানাপুরী নকশার প্রতিটি ভূমিখণ্ডে দাগ নম্বর প্রদান এবং মালিকানা ও দখলের তথ্য খতিয়ানে লিপিবদ্ধ। দাগভিত্তিক খতিয়ান বা রেকর্ড প্রস্তুত।
বুঝারত প্রস্তুত রেকর্ড ভূমি মালিককে বুঝিয়ে দেওয়া এবং তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ প্রদান। মাঠ পর্যায়ে রেকর্ড যাচাই ও সংশোধনের সুযোগ।

কিস্তোয়ার ও খানাপুরীর মধ্যে পার্থক্য

কিস্তোয়ার ও খানাপুরী পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও দুটির কাজ আলাদা। কিস্তোয়ারে মূলত ভূমিখণ্ডের পরিমাপ ও নকশা অঙ্কন করা হয়। আর খানাপুরীতে নকশায় অঙ্কিত ভূমিখণ্ডে দাগ নম্বর প্রদান এবং মালিকানা ও দখল-সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ানে লিপিবদ্ধ করা হয়।

কিস্তোয়ার জমি পরিমাপ ও নকশায় অঙ্কন
খানাপুরী দাগ নম্বর ও মালিকানা তথ্য লিপিবদ্ধ
বুঝারত রেকর্ড মালিককে বুঝিয়ে যাচাই

কিস্তোয়ার পর্যায়ে জমির মালিকের করণীয়

কিস্তোয়ার পর্যায়ে মূল কারিগরি কাজ আমিনগণ সম্পন্ন করেন। জমির মালিকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের জমির সীমানা ও অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান এবং জরিপ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।

তবে মালিকানা ও দখল-সংক্রান্ত দলিলপত্র উপস্থাপনের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আসে খানাপুরী পর্যায়ে। সরকারি নির্দেশনায় খানাপুরীর সময় ভূমি মালিকদের আমিনদলকে জমির মালিকানা ও দখল-সংক্রান্ত প্রমাণাদি উপস্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

সতর্কতা: কিস্তোয়ার পর্যায়ের কাজকে মালিকানা যাচাইয়ের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। কিস্তোয়ারে মূলত জমির পরিমাপ ও নকশায় প্রতিচ্ছবি অঙ্কনের কাজ সম্পন্ন হয়।

কিস্তোয়ার কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভূমি জরিপের নকশা তৈরির ক্ষেত্রে কিস্তোয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরবর্তী দাগভিত্তিক রেকর্ড প্রস্তুতের জন্য ভূমিখণ্ডের অবস্থান ও আকৃতি নকশায় সঠিকভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

একটি মৌজার জমিগুলো সঠিকভাবে পরিমাপ ও নকশায় অঙ্কন না হলে পরবর্তী সময়ে দাগ, সীমানা, জমির পরিমাণ ও অন্যান্য রেকর্ডের কাজেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই কিস্তোয়ার পর্যায়ের পরিমাপ ও নকশা প্রস্তুতের কাজ ভূমি জরিপের একটি মৌলিক অংশ।

ভূমি জরিপের ধারাবাহিকতায় কিস্তোয়ারের অবস্থান

সাধারণভাবে একটি ভূমি জরিপ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোকে ধারাবাহিকভাবে এভাবে দেখা যায়:

১. ট্রাভার্স সার্ভে জরিপের ভিত্তি ও প্রয়োজনীয় পয়েন্ট স্থাপন।
২. কিস্তোয়ার ভূমিখণ্ড পরিমাপ ও নকশায় প্রতিচ্ছবি অঙ্কন।
৩. খানাপুরী দাগ নম্বর ও মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য লিপিবদ্ধ।
৪. বুঝারত রেকর্ড মালিককে বুঝিয়ে দেওয়া ও যাচাই।
৫. তসদিক রেকর্ডের সত্যতা ও স্বত্বের আনুষ্ঠানিক প্রত্যয়ন।
৬. প্রকাশনা ও পরবর্তী ধাপ খসড়া প্রকাশনা, আপত্তি, আপিল ও চূড়ান্ত প্রকাশনা।

উপসংহার

কিস্তোয়ার হলো ভূমি জরিপের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাঠ পর্যায়ের ধাপ, যেখানে ট্রাভার্স পয়েন্টের সাহায্যে সরেজমিনে প্রতিটি ভূমিখণ্ড পরিমাপ করে তার প্রতিচ্ছবি জরিপের নকশায় অঙ্কন করা হয়।

কিস্তোয়ারের পর নকশায় অঙ্কিত ভূমিখণ্ডে দাগ নম্বর প্রদান, মালিকানা ও দখল-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং খতিয়ানে লিপিবদ্ধ করার কাজ খানাপুরী পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। এরপর বুঝারত, তসদিক, খসড়া প্রকাশনা এবং অন্যান্য ধাপের মাধ্যমে জরিপ কার্যক্রম এগিয়ে যায়।

এক কথায়: কিস্তোয়ার = জমি পরিমাপ + নকশায় ভূমিখণ্ডের প্রতিচ্ছবি অঙ্কন।

জমি-সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ

আপনার জমি মাপজোক, জরিপ, দাগ, সীমানা, খতিয়ান বা ভূমি-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে জানতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

☎
মোবাইল 01575401688
◉
WhatsApp 01575401688

আপনার জমি-সংক্রান্ত সমস্যাটি জানান

জমি মাপজোক, কিস্তোয়ার, দাগ, সীমানা, খতিয়ান বা অন্যান্য ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন।

পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন →

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top