খতিয়ান কত প্রকার ও কী কী? | খতিয়ানের ধরন ও বিস্তারিত
By admin / September 20, 2026
ভূমি রেকর্ড ও খতিয়ান

খতিয়ান কত প্রকার ও কী কী?

বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থায় প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের খতিয়ান, জরিপভিত্তিক রেকর্ড, বৈশিষ্ট্য এবং খতিয়ানের গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা।

খতিয়ান কী?

খতিয়ান হলো ভূমির মালিকানা, দখল, জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর, জমির শ্রেণি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণের জন্য প্রস্তুত করা সরকারি ভূমি রেকর্ড। এটি সাধারণভাবে Record of Rights (RoR) বা স্বত্বলিপি হিসেবেও পরিচিত।

ভূমি জরিপের মাধ্যমে একটি এলাকার জমির দাগ, সীমানা, পরিমাণ, মালিকানা ও অন্যান্য তথ্য নির্ধারণ করা হয় এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তী সময়ে নামজারি, জমাভাগ, জমা একত্রীকরণ বা অন্যান্য আইনগত কারণে রেকর্ডে পরিবর্তনও আনা হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ: খতিয়ানের ধরন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু “চার ধরনের খতিয়ান” বললে বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে বোঝানো হয় না। জরিপের ধরন, এলাকার বিশেষ জরিপ এবং পরবর্তী নামজারি বা হালনাগাদ রেকর্ডের ভিত্তিতে খতিয়ানের পরিচিতি ভিন্ন হতে পারে।

১ CS খতিয়ান

CS এর পূর্ণরূপ Cadastral Survey। এটি বাংলাদেশের প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমি জরিপভিত্তিক খতিয়ানগুলোর একটি।

ক্যাডাস্ট্রাল জরিপের মাধ্যমে জমির দাগ, সীমানা, পরিমাণ, মালিকানা ও অন্যান্য ভূমি-সংক্রান্ত তথ্য লিপিবদ্ধ করে মৌজা নকশা ও খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়।

কোনো জমির পুরোনো মালিকানা ও দাগের ইতিহাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে CS খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ একটি রেকর্ড। পরবর্তী জরিপের রেকর্ডের সঙ্গে পুরোনো তথ্যের ধারাবাহিকতা বোঝার ক্ষেত্রেও এটি কাজে আসে।

২ SA খতিয়ান

SA এর পূর্ণরূপ State Acquisition। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণের পর ভূমি মালিকানা ও স্বত্বের তথ্য রেকর্ড করার জন্য SA খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর প্রেক্ষাপটে জমিদারি স্বত্ব অধিগ্রহণের পর প্রজাদের নামে খতিয়ান প্রস্তুতের ব্যবস্থা করা হয়।

SA খতিয়ান প্রস্তুতের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী রেকর্ড ও বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি সরাসরি মাঠ পর্যায়ে পরিচালিত সাধারণ ক্যাডাস্ট্রাল জরিপের মতো ছিল না।

৩ RS খতিয়ান

RS এর পূর্ণরূপ Revisional Survey। পূর্ববর্তী ভূমি রেকর্ডের সংশোধন ও হালনাগাদের জন্য রিভিশনাল সার্ভের মাধ্যমে RS খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়।

RS জরিপে জমির দাগ, সীমানা, পরিমাণ, মালিকানা ও দখলসহ বিভিন্ন তথ্য মাঠ পর্যায়ে যাচাই করে সংশোধিত ভূমি রেকর্ড প্রস্তুত করা হয়।

কোনো জমির বর্তমান বা পরবর্তী রেকর্ডের ধারাবাহিকতা বুঝতে RS খতিয়ানের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। অনেক এলাকায় এটি পরবর্তী ভূমি রেকর্ড যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

৪ BS খতিয়ান

BS বলতে সাধারণভাবে Bangladesh Survey বা বাংলাদেশ জরিপভিত্তিক খতিয়ানকে বোঝানো হয়।

বাংলাদেশ জরিপের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় আধুনিকভাবে ভূমির দাগ, সীমানা, মালিকানা, জমির শ্রেণি ও পরিমাণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সরকারি ভূমি-সংক্রান্ত নথিতে RS/BS খতিয়ানের উল্লেখ রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকার ক্ষেত্রে BS রেকর্ড প্রযোজ্য হলে সংশ্লিষ্ট জমির বর্তমান রেকর্ড যাচাইয়ের সময় তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

৫ মহানগর বা সিটি খতিয়ান

মহানগর এলাকার জন্য পরিচালিত বিশেষ জরিপের ভিত্তিতে প্রস্তুত খতিয়ানকে সাধারণভাবে মহানগর বা সিটি খতিয়ান বলা হয়।

মহানগর জরিপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার মৌজা নকশা ও স্বত্বলিপি প্রস্তুত করা হয়। বিশেষ করে শহর ও মহানগর এলাকার জমির রেকর্ড যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই খতিয়ানের গুরুত্ব রয়েছে।

সরকারি ভূমি-সংক্রান্ত নথিতে মহানগর খতিয়ানের আলাদা উল্লেখ পাওয়া যায়। তাই কোনো জমি মহানগর জরিপের আওতাভুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট সিটি বা মহানগর রেকর্ডও যাচাই করা প্রয়োজন।

৬ দিয়ারা খতিয়ান

নদী বা সমুদ্রের কারণে ভূমির অবস্থান ও সীমানায় পরিবর্তন ঘটে এমন এলাকায় বিশেষ ধরনের জরিপ পরিচালিত হয়, যাকে দিয়ারা জরিপ বলা হয়।

নদীভাঙন, নতুন চর জেগে ওঠা বা পয়স্তি ভূমির পরিবর্তিত অবস্থার ভিত্তিতে নকশা ও রেকর্ড প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে দিয়ারা জরিপের ভূমিকা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট এলাকায় দিয়ারা জরিপের রেকর্ড প্রযোজ্য হলে জমির অবস্থান, দাগ ও স্বত্বের তথ্য যাচাইয়ের সময় সেই রেকর্ড বিবেচনা করা হয়।

৭ নামজারি খতিয়ান

উত্তরাধিকার, রেজিস্ট্রি দলিল, জমি হস্তান্তর, জমাভাগ, জমা একত্রীকরণ বা অন্যান্য আইনগত কারণে ভূমির মালিকানায় পরিবর্তন হলে রেকর্ড হালনাগাদ করার প্রয়োজন হয়।

নামজারির কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন খতিয়ান খোলা হয়। সরকারি নির্দেশনায় নামজারি খতিয়ান প্রস্তুত ও সংরক্ষণের বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ রয়েছে।

তাই নামজারি খতিয়ানকে CS, SA বা RS-এর মতো একটি ঐতিহাসিক জরিপের নাম হিসেবে না দেখে রেকর্ড হালনাগাদের মাধ্যমে সৃষ্ট খতিয়ান হিসেবে বোঝা বেশি সঠিক।

খতিয়ানের ধরন এক নজরে

খতিয়ানের নাম সম্পর্কিত জরিপ/প্রক্রিয়া প্রধান বৈশিষ্ট্য
CS খতিয়ান Cadastral Survey ঐতিহাসিক ক্যাডাস্ট্রাল জরিপভিত্তিক ভূমি রেকর্ড।
SA খতিয়ান State Acquisition রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ-পরবর্তী ভূমি স্বত্বের রেকর্ড।
RS খতিয়ান Revisional Survey পূর্ববর্তী রেকর্ড সংশোধন ও হালনাগাদের জন্য প্রস্তুত জরিপভিত্তিক রেকর্ড।
BS খতিয়ান Bangladesh Survey বাংলাদেশ জরিপভিত্তিক ভূমি রেকর্ড।
মহানগর/সিটি খতিয়ান মহানগর জরিপ মহানগর এলাকার বিশেষ জরিপের ভিত্তিতে প্রস্তুত রেকর্ড।
দিয়ারা খতিয়ান দিয়ারা জরিপ নদী, চর ও পরিবর্তিত ভূমির বিশেষ জরিপভিত্তিক রেকর্ড।
নামজারি খতিয়ান নামজারি ও রেকর্ড হালনাগাদ মালিকানা বা ভূমির অবস্থায় আইনগত পরিবর্তনের পর প্রস্তুত নতুন রেকর্ড।

খতিয়ানের ধরন ও জরিপের ধরন কি একই?

খতিয়ান ও জরিপ একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও দুটিকে একই বিষয় বলা যায় না। জরিপ হলো ভূমির তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, নকশা ও রেকর্ড প্রস্তুতের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম। আর খতিয়ান হলো সেই কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রস্তুত করা ভূমি স্বত্বের রেকর্ড।

যেমন CS একটি জরিপের নাম এবং সেই জরিপের মাধ্যমে প্রস্তুত রেকর্ডকে CS খতিয়ান বলা হয়। একইভাবে SA ও RS জরিপের সঙ্গে যথাক্রমে SA ও RS খতিয়ানের সম্পর্ক রয়েছে।

সহজভাবে মনে রাখুন: জরিপ হলো রেকর্ড প্রস্তুতের কার্যক্রম, আর খতিয়ান হলো ভূমি-সংক্রান্ত তথ্যের প্রস্তুতকৃত রেকর্ড।

খতিয়ানে সাধারণত কী কী তথ্য থাকে?

খতিয়ানের নির্দিষ্ট ফরম ও জরিপভেদে কলাম বা তথ্যের বিন্যাসে পার্থক্য থাকতে পারে। তবে ভূমি রেকর্ডে সাধারণত মালিকের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, ঠিকানা, অংশ, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, জমির শ্রেণি এবং প্রয়োজনীয় মন্তব্যের মতো তথ্য থাকে।

মালিকের নাম রেকর্ডভুক্ত মালিক বা স্বত্বাধিকারীর নাম।
পিতা/স্বামীর নাম ও ঠিকানা মালিককে সঠিকভাবে শনাক্ত করার প্রয়োজনীয় তথ্য।
খতিয়ান নম্বর সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড শনাক্ত করার নম্বর।
দাগ নম্বর মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট জমির প্লট শনাক্ত করার নম্বর।
জমির পরিমাণ সংশ্লিষ্ট দাগ বা রেকর্ডভুক্ত জমির পরিমাণ।
জমির শ্রেণি জমির বর্তমান বা রেকর্ডভুক্ত শ্রেণি সংক্রান্ত তথ্য।

খতিয়ানের ধরন জানা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

একটি জমির মালিকানা ও রেকর্ডের ইতিহাস বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট জমির কোন জরিপের খতিয়ান রয়েছে তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। একই জমির ক্ষেত্রে পুরোনো ও পরবর্তী জরিপে খতিয়ান নম্বর এবং দাগ নম্বর পরিবর্তিত হতে পারে।

তাই জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার, জমি ভাগ, সীমানা নির্ধারণ, রেকর্ড যাচাই বা ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে শুধু একটি খতিয়ান দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট জরিপের রেকর্ড, মৌজা নকশা, দাগের হাল-সাবেক তথ্য এবং প্রয়োজনীয় দলিলের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

একই জমির বিভিন্ন খতিয়ানের সম্পর্ক

একটি জমির রেকর্ড সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন জরিপ ও রেকর্ড হালনাগাদের মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে। পুরোনো CS দাগের সঙ্গে পরবর্তী SA বা RS দাগের সম্পর্ক এবং পরবর্তী রেকর্ডে তার অবস্থান বুঝতে হাল-সাবেক দাগ, দাগের সূচি, মৌজা নকশা ও সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি জরিপ নির্দেশিকাতেও হাল খতিয়ানে পূর্ববর্তী SA খতিয়ানের রেফারেন্স এবং দাগের হাল-সাবেক তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি উল্লেখ আছে।

উপসংহার

“খতিয়ান কত প্রকার?”—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে শুধু চারটি নাম উল্লেখ করলেই পুরো বিষয়টি বোঝানো যায় না। বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থায় CS, SA, RS, BS, মহানগর বা সিটি রেকর্ড, দিয়ারা জরিপভিত্তিক রেকর্ড এবং নামজারি খতিয়ানের মতো বিভিন্ন ধরনের ভূমি রেকর্ডের ব্যবহার রয়েছে।

কোনো জমির ক্ষেত্রে কোন খতিয়ান প্রযোজ্য তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট এলাকার জরিপ, রেকর্ডের সময়কাল এবং পরবর্তী হালনাগাদ কার্যক্রমের ওপর। তাই জমি-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে খতিয়ান যাচাই করার সময় খতিয়ান নম্বরের পাশাপাশি জরিপের নাম, দাগ নম্বর, মৌজা নকশা এবং হাল-সাবেক তথ্যও দেখা প্রয়োজন।

জমি-সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ

আপনার জমির খতিয়ান, দাগ, রেকর্ড, সীমানা বা ভূমি-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে জানতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

☎
মোবাইল 01575401688
◉
WhatsApp 01575401688

আপনার জমি-সংক্রান্ত সমস্যাটি জানান

খতিয়ান, দাগ, জমির সীমানা, ভূমি রেকর্ড বা অন্যান্য ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন।

পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন →

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top