ভূমি কত প্রকার ও কী কী?
ভূমির মৌলিক শ্রেণিবিভাগ, কৃষি ও অকৃষি ভূমি, ব্যবহারভিত্তিক ভূমির শ্রেণি এবং ভূমির শ্রেণি নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা।
ভূমি কী?
ভূমি বলতে পৃথিবীর উপরিভাগের সেই স্থলভাগকে বোঝায়, যার ওপর মানুষ বসবাস, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, যোগাযোগসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে। ভূমি শুধু মাটির একটি অংশ নয়; এর অবস্থান, ব্যবহার, শ্রেণি, দখল, মালিকানা এবং রেকর্ড—সবকিছু ভূমি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে ভূমির ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিভিন্নভাবে ভূমির শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। তাই “ভূমি কত প্রকার?” প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় কোন ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস করা হচ্ছে তা আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
গুরুত্বপূর্ণ: মৌলিকভাবে ভূমিকে কৃষি ও অকৃষি—এই দুই বৃহৎ শ্রেণিতে ভাগ করে বোঝানো যায়। তবে ভূমির প্রকৃত ব্যবহার ও ভূমি রেকর্ডে ব্যবহৃত শ্রেণির ভিত্তিতে এর আরও বিস্তারিত শ্রেণিবিভাগ রয়েছে।
ভূমি প্রধানত কত প্রকার?
সাধারণভাবে ব্যবহারভিত্তিক মৌলিক শ্রেণিবিন্যাসে ভূমিকে প্রধানত ২ প্রকার হিসেবে বোঝানো হয়—
১ কৃষি ভূমি
যে ভূমি কৃষিকাজ, ফসল উৎপাদন বা কৃষি-সম্পর্কিত কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়, তাকে সাধারণভাবে কৃষি ভূমি বলা হয়।
বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি, ডাল, তেলবীজসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জমি কৃষি ভূমির অন্তর্ভুক্ত। কৃষি ভূমির প্রকৃতি, ব্যবহার এবং রেকর্ডভুক্ত শ্রেণি অনুযায়ী এর ব্যবহারভেদে পার্থক্য থাকতে পারে।
কৃষি ভূমি দেশের খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই কৃষিজমির শ্রেণি ও ব্যবহার নির্ধারণ ভূমি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২ অকৃষি ভূমি
যে ভূমি কৃষিকাজের পরিবর্তে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ বা অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়, তাকে সাধারণভাবে অকৃষি ভূমি বলা হয়।
বসতবাড়ি, দোকানপাট, বাজার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়কসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার অকৃষি ভূমির আওতায় থাকতে পারে।
তবে কোনো জমিকে শুধু বর্তমান ব্যবহারের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে শ্রেণিবদ্ধ করার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড, সরকারি শ্রেণি এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধান বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ব্যবহারভেদে ভূমির শ্রেণি কী কী?
কৃষি ও অকৃষি—এই দুটি বৃহৎ শ্রেণির মধ্যে ভূমির প্রকৃত ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আরও বিভিন্ন শ্রেণি দেখা যায়। জরিপ ও ভূমি রেকর্ডে জমির প্রকৃতি ও ব্যবহার নির্ধারণের জন্য এসব শ্রেণির তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
১ নাল বা চাষযোগ্য জমি
নাল বলতে সাধারণভাবে চাষাবাদযোগ্য কৃষিজমিকে বোঝানো হয়। ফসল উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জমির ক্ষেত্রে এই শ্রেণির উল্লেখ পাওয়া যায়।
২ ভিটি বা বসতভূমি
বসতবাড়ি নির্মাণ ও বসবাসের জন্য ব্যবহৃত ভূমিকে সাধারণভাবে ভিটি বা বসতভূমি বলা হয়। গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের আবাসিক ভূমির ক্ষেত্রে এই শ্রেণির ব্যবহার দেখা যায়।
৩ বাণিজ্যিক ভূমি
দোকান, মার্কেট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত ভূমিকে বাণিজ্যিক ভূমি বলা হয়।
৪ শিল্প ভূমি
কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা শিল্প-সম্পর্কিত কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত জমি শিল্প ভূমি হিসেবে বিবেচিত হয়।
৫ জলাভূমি ও জলাশয়
পুকুর, খাল, বিল, জলাভূমি এবং অন্যান্য জলাধারভিত্তিক ভূমি পৃথক শ্রেণি হিসেবে রেকর্ড ও জরিপের ক্ষেত্রে চিহ্নিত করা হয়।
৬ বনভূমি
বন ও বৃক্ষাচ্ছাদিত এলাকার ভূমিকে বনভূমি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। এ ধরনের ভূমির ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা সাধারণ কৃষি বা আবাসিক জমির তুলনায় ভিন্ন।
৭ গোচারণ ভূমি
গবাদিপশু চরানোর জন্য ব্যবহৃত বা নির্ধারিত জমিকে গোচারণ ভূমি বলা হয়। ভূমি জরিপ ও রেকর্ডে এ ধরনের ভূমির শ্রেণি আলাদাভাবে উল্লেখ করা হতে পারে।
৮ পাহাড়ি ভূমি
পাহাড় বা টিলা-প্রধান এলাকার ভূমি তার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পৃথক ভূমি শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
৯ রাস্তা ও যোগাযোগের ভূমি
সড়ক, রাস্তা ও অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য ব্যবহৃত ভূমি পৃথক ব্যবহারভিত্তিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ভূমি জরিপ ও নকশায় এসব ভূমির অবস্থানও চিহ্নিত করা হয়।
১০ বাজার ও অন্যান্য জনসাধারণের ব্যবহার্য ভূমি
বাজার, জনসাধারণের ব্যবহার্য স্থান এবং বিভিন্ন সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ব্যবহৃত জমিও ভূমির ব্যবহারভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে পৃথকভাবে চিহ্নিত হতে পারে।
ভূমির শ্রেণি এক নজরে
| ভূমির শ্রেণি | সাধারণ ব্যবহার | প্রধান বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| কৃষি ভূমি | চাষাবাদ ও ফসল উৎপাদন | কৃষিকাজের জন্য ব্যবহৃত ভূমি। |
| অকৃষি ভূমি | আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও অন্যান্য ব্যবহার | কৃষিকাজের বাইরে বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত ভূমি। |
| নাল | কৃষিকাজ | চাষযোগ্য জমির সঙ্গে সম্পর্কিত শ্রেণি। |
| ভিটি | বসতবাড়ি | আবাসিক ও বসবাসের কাজে ব্যবহৃত ভূমি। |
| বাণিজ্যিক | দোকান, মার্কেট ও ব্যবসা | বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত ভূমি। |
| শিল্প | কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান | শিল্প কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত ভূমি। |
| জলাভূমি/জলাশয় | পুকুর, খাল, বিল ও জলাধার | জলভিত্তিক ভূমি ও জলাধার। |
| বনভূমি | বন ও বৃক্ষসম্পদ | বন ও বৃক্ষাচ্ছাদিত এলাকা। |
| গোচারণ ভূমি | গবাদিপশু চরানো | চারণের জন্য ব্যবহৃত বা নির্ধারিত ভূমি। |
| পাহাড়ি ভূমি | পাহাড় ও টিলা এলাকা | ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পৃথক ভূমি। |
| রাস্তা ও যোগাযোগ | সড়ক ও যোগাযোগ | যোগাযোগ অবকাঠামোর জন্য ব্যবহৃত ভূমি। |
খতিয়ানে ভূমির শ্রেণি কেন উল্লেখ থাকে?
ভূমি জরিপের সময় শুধু মালিকের নাম ও জমির পরিমাণ লিপিবদ্ধ করা হয় না; জমির শ্রেণি ও ব্যবহার সম্পর্কিত তথ্যও রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে একটি দাগের জমি কী ধরনের এবং কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, সে সম্পর্কে সরকারি রেকর্ডে তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
তাই কোনো জমির খতিয়ান যাচাই করার সময় মালিকের নাম, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণের পাশাপাশি জমির শ্রেণি সম্পর্কিত তথ্যও দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমির শ্রেণি ও বর্তমান ব্যবহার কি একই বিষয়?
ভূমির রেকর্ডভুক্ত শ্রেণি এবং জমির বর্তমান ব্যবহারকে সব ক্ষেত্রে একই বিষয় হিসেবে দেখা যায় না। কোনো জমির রেকর্ডে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি উল্লেখ থাকতে পারে, আবার বাস্তবে সেই জমিতে ভিন্ন ধরনের ব্যবহার দেখা যেতে পারে।
তাই জমির শ্রেণি বা ব্যবহার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, মৌজা নকশা, ভূমি রেকর্ড এবং প্রযোজ্য সরকারি বিধান একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গুরুত্বপূর্ণ: কোনো জমি বর্তমানে কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সরকারি রেকর্ডে জমিটির শ্রেণি কী—এই দুটি তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ভূমির শ্রেণি জানা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জমি কেনাবেচা, ভূমি উন্নয়ন কর, জমির ব্যবহার, নির্মাণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং রেকর্ড যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে কাজ করে।
কোন ভিত্তিতে ভূমির শ্রেণিবিভাগ করা হয়?
ভূমির শ্রেণিবিভাগ একাধিক ভিত্তিতে করা হতে পারে। যেমন— ভূমির প্রকৃতি, কৃষি বা অকৃষি ব্যবহার, বর্তমান ব্যবহার, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং সরকারি ভূমি রেকর্ডে নির্ধারিত শ্রেণি।
এ কারণে একটি জমিকে শুধু একটি সাধারণ নাম দিয়ে চিহ্নিত করলে সব তথ্য প্রকাশ পায় না। সংশ্লিষ্ট জমির খতিয়ান, দাগ, মৌজা নকশা এবং সরকারি রেকর্ড দেখে তার নির্দিষ্ট শ্রেণি বোঝা যায়।
ভূমির শ্রেণি ও ভূমির পরিমাণ এক বিষয় নয়
ভূমির শ্রেণি জমিটি কী ধরনের বা কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তা নির্দেশ করে। অন্যদিকে ভূমির পরিমাণ হলো জমির আয়তন বা মাপ।
উদাহরণ হিসেবে, একটি জমির পরিমাণ ২০ শতাংশ হতে পারে এবং সেই জমির শ্রেণি হতে পারে কৃষি। আবার একই পরিমাণের অন্য একটি জমি বসতভূমি বা বাণিজ্যিক শ্রেণির হতে পারে। তাই জমির পরিমাণ ও শ্রেণি দুটি আলাদা তথ্য।
উপসংহার
ভূমি কত প্রকার?—এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো, মৌলিক ব্যবহারভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে ভূমিকে কৃষি ও অকৃষি—এই দুই বৃহৎ শ্রেণিতে ভাগ করে বোঝানো যায়। তবে ভূমির প্রকৃতি, ব্যবহার ও সরকারি রেকর্ডের ভিত্তিতে এর আরও বিস্তারিত শ্রেণিবিভাগ রয়েছে।
নাল, ভিটি, বাণিজ্যিক, শিল্প, জলাভূমি, জলাশয়, বনভূমি, গোচারণ, পাহাড়ি ভূমি, রাস্তা ও যোগাযোগের ভূমিসহ বিভিন্ন শ্রেণি ভূমি জরিপ ও রেকর্ডে চিহ্নিত হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট জমির শ্রেণি জানতে হলে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, মৌজা নকশা এবং সরকারি ভূমি রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।
এক কথায়: ভূমির মৌলিক শ্রেণি কৃষি ও অকৃষি— আর ভূমির প্রকৃতি ও ব্যবহার অনুযায়ী এর আরও বিভিন্ন শ্রেণি নির্ধারিত হয়।
জমি-সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ
আপনার জমির শ্রেণি, খতিয়ান, দাগ, সীমানা বা ভূমি-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে জানতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
আপনার জমি-সংক্রান্ত সমস্যাটি জানান
জমির শ্রেণি, জরিপ, দাগ, খতিয়ান, সীমানা বা অন্যান্য ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন।
পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন →