আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিল কী? চিহ্ন ও হিস্যা নির্ণয়ের নিয়ম
পুরোনো ভূমি রেকর্ড ও খতিয়ানে জমির অংশ বা হিস্যা বোঝাতে আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিলের ব্যবহার দেখা যায়। এসব এককের পরিচয়, চিহ্ন, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং হিস্যা নির্ণয়ের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিল কী?
আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিল হলো পুরোনো ভূমি রেকর্ডে জমির স্বত্ব বা হিস্যার অংশ প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত ভগ্নাংশভিত্তিক একক। কোনো সম্পূর্ণ স্বত্বের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কতটুকু অংশ রয়েছে, তা বোঝাতে এসব একক ব্যবহার করা হতো।
বর্তমানে জমির পরিমাণ সাধারণত শতাংশ, কাঠা, বিঘা বা অন্যান্য প্রচলিত পরিমাপের মাধ্যমে প্রকাশ করা হলেও পুরোনো খতিয়ান বুঝতে আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিলের হিস্যা সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।
ভূমি রেকর্ডে এসব এককের ব্যবহার
পুরোনো ভূমি রেকর্ডে জমির স্বত্বকে একটি পূর্ণ অংশ ধরে তার মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তির অংশ নির্ধারণ করা হতো। সেই অংশকে আরও ছোট ছোট ভাগে প্রকাশ করার জন্য আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিলের ব্যবহার করা হয়েছে।
ফলে কোনো পুরোনো খতিয়ানে মালিকের নামের পাশে হিস্যা উল্লেখ থাকলে সেখানে ব্যবহৃত চিহ্ন ও সংখ্যাগুলো সঠিকভাবে পড়তে পারলে সংশ্লিষ্ট স্বত্বের অংশ বোঝা যায়।
আনার হিস্যা কী?
প্রচলিত হিসাবপদ্ধতিতে একটি পূর্ণ হিস্যাকে ১৬ আনা হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ, ১৬ আনা একটি পূর্ণ অংশের সমান।
১ পূর্ণ অংশ = ১৬ আনা
আনার পরিমাণকে আরও সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করার প্রয়োজন হলে তার অধীনস্থ ছোট একক—গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিল— ব্যবহার করা হয়।
আনার চিহ্ন
পুরোনো খতিয়ানে আনার হিস্যা বিভিন্ন বিশেষ চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করা হতে পারে। এসব চিহ্ন দেখে আনার পরিমাণ শনাক্ত করা যায়।
| চিহ্ন | আনার পরিমাণ |
|---|---|
| ⁄ | ১ আনা |
| ৵ | ২ আনা |
| ৶ | ৩ আনা |
| ৷ | ৪ আনা |
| ৷⁄ | ৫ আনা |
| ৷৵ | ৬ আনা |
| ৷৶ | ৭ আনা |
| ৷৷ | ৮ আনা |
| ৷৷⁄ | ৯ আনা |
| ৷৷৵ | ১০ আনা |
| ৷৷৶ | ১১ আনা |
| ৸ | ১২ আনা |
| ৸⁄ | ১৩ আনা |
| ৸৵ | ১৪ আনা |
| ৸৶ | ১৫ আনা |
| ১ | ১৬ আনা |
গন্ডা কী?
গন্ডা হলো আনার অধীনস্থ একটি ক্ষুদ্রতর হিস্যা একক। প্রচলিত হিসাবে ২০ গন্ডা = ১ আনা। তাই কোনো খতিয়ানে আনার পরিবর্তে বা আনার সঙ্গে গন্ডার হিস্যা উল্লেখ থাকলে এই সম্পর্কের ভিত্তিতে হিসাব করা যায়।
২০ গন্ডা = ১ আনা
গন্ডার জন্য আলাদা কোনো বিশেষ চিহ্ন ব্যবহৃত হয় না। সাধারণত সংখ্যা দিয়ে গন্ডার পরিমাণ প্রকাশ করা হয়।
কড়া কী এবং এর চিহ্ন
গন্ডার পরবর্তী ক্ষুদ্রতর একক হলো কড়া। প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী ৪ কড়া = ১ গন্ডা।
১ গন্ডা = ৪ কড়া
কড়ার হিস্যা প্রকাশের জন্য বিশেষ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। কড়ার চিহ্ন দেখে সংশ্লিষ্ট হিস্যার পরিমাণ বোঝা যায়।
| চিহ্ন | কড়ার পরিমাণ |
|---|---|
| ৷ | ১ কড়া |
| ৷৷ | ২ কড়া |
| ৸ | ৩ কড়া |
ক্রান্তি কী এবং এর চিহ্ন
কড়ার পরবর্তী ক্ষুদ্রতর একক হলো ক্রান্তি। প্রচলিত হিসাবে ৩ ক্রান্তি = ১ কড়া।
১ কড়া = ৩ ক্রান্তি
ক্রান্তির হিস্যা প্রকাশের জন্যও নির্দিষ্ট চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
| চিহ্ন | ক্রান্তির পরিমাণ |
|---|---|
| ৴ | ১ ক্রান্তি |
| ৴৴ | ২ ক্রান্তি |
তিল কী?
তিল হলো এই হিস্যা-পদ্ধতির আরও ক্ষুদ্র একটি একক। প্রচলিত হিসাবে ২০ তিল = ১ ক্রান্তি।
১ ক্রান্তি = ২০ তিল
তিলের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ চিহ্ন নেই। সাধারণত সংখ্যা দিয়ে তিলের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়।
আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিলের পারস্পরিক সম্পর্ক
এই হিস্যা-পদ্ধতিতে প্রতিটি একক পরবর্তী ক্ষুদ্রতর এককের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে সম্পর্কযুক্ত। বড় একক থেকে ছোট এককের দিকে সম্পর্কগুলো হলো—
- ১৬ আনা = ১ পূর্ণ অংশ
- ২০ গন্ডা = ১ আনা
- ৪ কড়া = ১ গন্ডা
- ৩ ক্রান্তি = ১ কড়া
- ২০ তিল = ১ ক্রান্তি
আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিলের ক্রম
আনা → গন্ডা → কড়া → ক্রান্তি → তিল
অর্থাৎ, একটি পূর্ণ অংশকে প্রথমে আনার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এরপর আনার অংশকে আরও সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করতে গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিলের ব্যবহার করা হয়।
খতিয়ানে এসব হিস্যা কীভাবে লেখা থাকে?
পুরোনো খতিয়ানে জমির স্বত্ব বা অংশের তথ্যের সঙ্গে হিস্যাও উল্লেখ থাকতে পারে। সেখানে সংখ্যা ও বিশেষ চিহ্নের সমন্বয়ে কোনো ব্যক্তির অংশ প্রকাশ করা হয়।
তাই কোনো পুরোনো খতিয়ানে হিস্যা দেখার সময় শুধু সংখ্যাটি দেখলে হবে না; সংখ্যার সঙ্গে ব্যবহৃত চিহ্নটির অর্থও বুঝতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ: পুরোনো খতিয়ানের লেখা বা চিহ্ন অনেক সময় বর্তমান প্রচলিত সংখ্যার মতো সরাসরি বোঝা যায় না। তাই হিস্যা পড়ার সময় সংশ্লিষ্ট এককের চিহ্ন ও পারস্পরিক সম্পর্ক জানা প্রয়োজন।
হিস্যা থেকে জমির পরিমাণ বের করার নিয়ম
কোনো ব্যক্তির হিস্যা থেকে জমির পরিমাণ নির্ণয় করতে হলে প্রথমে খতিয়ানে উল্লেখিত মোট জমির পরিমাণ জানতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট হিস্যাকে পূর্ণ অংশের ভগ্নাংশ হিসেবে নির্ণয় করে মোট জমির ওপর তা প্রয়োগ করতে হবে।
প্রাপ্য জমি = মোট জমির পরিমাণ × সংশ্লিষ্ট হিস্যা
উদাহরণ হিসেবে, কোনো খতিয়ানে মোট জমির পরিমাণ ১৬ শতাংশ এবং সংশ্লিষ্ট হিস্যা যদি অর্ধেক হয়, তাহলে হিস্যা অনুযায়ী জমির পরিমাণ হবে—
১৬ শতাংশ × ১/২ = ৮ শতাংশ
একইভাবে, আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিলের হিস্যাকে প্রয়োজন অনুযায়ী পূর্ণ অংশের ভগ্নাংশে রূপান্তর করে মোট জমির পরিমাণের ওপর প্রয়োগ করা যায়।
হিস্যা নির্ণয়ের সময় কী কী দেখতে হবে?
- খতিয়ানে উল্লেখিত মোট জমির পরিমাণ প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে।
- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হিস্যার পরিমাণ শনাক্ত করতে হবে।
- হিস্যায় ব্যবহৃত চিহ্ন ও সংখ্যার অর্থ বুঝতে হবে।
- আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিলের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসরণ করতে হবে।
- হিস্যাকে প্রয়োজন অনুযায়ী ভগ্নাংশে রূপান্তর করে মোট জমির ওপর প্রয়োগ করতে হবে।
আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিল কেন জানা প্রয়োজন?
পুরোনো ভূমি রেকর্ড ও খতিয়ানের তথ্য বুঝতে এসব হিস্যা এককের জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পুরোনো কোনো খতিয়ানে মালিকের অংশ যদি আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিলের মাধ্যমে প্রকাশ করা থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট হিস্যার প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য এসব এককের সম্পর্ক জানা প্রয়োজন।
ভূমি রেকর্ডের তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে খতিয়ানের দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং স্বত্বের হিস্যার তথ্য পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই হিস্যা বুঝতে পারলে পুরোনো ভূমি রেকর্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সহজে বোঝা যায়।
জমির হিস্যা বা ভূমি রেকর্ড বুঝতে সহায়তা প্রয়োজন?
খতিয়ান, দাগ, জমির পরিমাণ, হিস্যা বা ভূমি রেকর্ডসংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন।
আপনার জমি-সংক্রান্ত সমস্যাটি জানান
জমির খতিয়ান, দাগ, নকশা, পরিমাপ বা অন্যান্য ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার সমস্যাটি আমাদের জানান।
